Facts

প্রতি বছর ১লা মে শ্রমিক দিবস পালন করা হয় কেনো জানেন?

মে দিবস

⬛ আজ পহেলা মে। আর এই মহান মে দিবসে আমরা দেশের সকল শ্রমজীবী মানুষকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের মহান ‘ মে দিবস ‘ আজ।

মে দিবস হচ্ছে  গোটা পৃথিবীর শ্রমজীবী সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচনা করার দিন। মে দিবসের পেছনে রয়েছে শ্রমিক শ্রেণীর আত্মদান ও বিরোচিত  সংগ্রামের  ইতিহাস। শ্রেনী বৈষম্যের বেঁড়াজালে যখন তাদের জীবন বন্দী ছিল তখন মে দিবসের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খুলে যায় তাদের শৃঙ্খল। এর ফলে আস্তে আস্তে লোপ পেতে লাগলো সমাজের শ্রেণী বৈষম্য।।

⬛ এই দিনটি স্মরনীয় থাকার পিছনে আছে একটি রক্তপাতের ইতিহাস, আন্দোলনের ইতিহাস। শ্রমিকরা আজও নির্যাতিত, পান না তাঁদের ন্যায্য মজুরি। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ অবস্থা ছিল আরো খারাপ। এই সময় শ্রমিক দের দিনে গড়ে ১২ ঘন্টা কাজ করিয়ে বিনিময়ে সামান্য মজুরি দিয়ে শিল্প মালিকরা অধিক লাভ ভোগ করত। মানবেতর জীবনযাপন করত শ্রমিকেরা, তার উপর ছিল মালিকপক্ষের অনবরত অকথ্য নির্যাতন।

১৮৬০ সালে শ্রমিকরা তাঁদের মজুরি না কেটে দিনে ৮ ঘন্টা শ্রম নির্ধারণের জন্য প্রথম দাবি জানান। কিন্তু সংগঠনের অভাবে এ দাবি জোরালো করা সম্ভব হয় নি। এই সময় সমাজতন্ত্র শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। তারা বুঝতে পারে ন্যায্য দাবি আদায়ে শক্তিশালী সংগঠনের বিকল্প নেই। ১৮৮০-৮১ সালে প্রতিষ্ঠা করে  Federation of organized Trades and Labor Unions Of the United States and Canada পরে ১৮৮৬ সালে পরিবর্তন করে American Federation of Labor করা হয়।
এই সংগঠন শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অবিরত আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। তাদের স্লোগান ছিল – ” Eight hours for work, eight hours for rest, eight hours for what we will “.


১৮৮৪ সালে সংঘটি যুক্ত রাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘন্টা মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাব পাশ করে এবং তাদের এ দাবি কার্যকর করার জন্য তারা সময় বেধে দেন ১৮৮৬ সালের পহেলা মে পর্যন্ত। বারবার দাবি জানিয়ে বনিক – মালিক শ্রেণীর কোন সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদী ও দাবি আদায়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে। এসময় এলার্ম নামক একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এ বিষয়ে এক আলোড়ন তোলা একটি কলাম। এর ফলে বিদ্রোহ চরমে ওঠে। আর শিকাগো হয়ে ওঠে প্রতিবাদ বিদ্রোহের মূল মঞ্চ।


⬛ ১লামে যতই এগিয়ে আসছিল, মালিক – বনিক শ্রেণী অবধারিত ভাবে ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। দুই পক্ষের সংঘর্ষ অবধারিত হয়ে উঠেছিল। পুলিশ আগেই শ্রমিকদের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছেন। শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে পুলিশকে ২০০০ ডলারের মেশিন গান কিনে দেয় শিকাগো বানিজ্যিক ইলিনয়।
১ লা মে সমগ্ৰ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক কাজ ফেলে নেমে রাস্তায় আসে। শিকাগোতে শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটে প্রায় ৪০,০০০ শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রস্থলে জড়ো হয়। অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা, মিছিলে, মিটিং, ধর্মঘট, বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছু মিলে আন্দোলন চরমে ওঠে।

পার্সন্স, জোয়ান, আগষ্ট স্পীজ,লুই সিং সহ আরও অনেকে শ্রমিকদের প্রতিনিধি হয়ে উঠেন। ৩ মে কারো মতে ৪ মে, ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে- মার্কেট স্কয়ার নামক এক বানিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগন মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। তারা ১৮৭২ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করেছিলেন। অগাস্ট স্পীজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলেছিলেন।  হঠাৎ করে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে, এতে মেথিয়াস জে, ডিগান নামের একজন পুলিশ মারা যায় এবং ১১ জন আহত হয়, পরে আরও ৬ জন নিহত হয়। পুলিশ বাহিনী শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা দাঙ্গার রূপ নেয় এবং এতে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন।

পুলিশ হত্যা মামলায় অগাস্ট স্পীজ সহ মোট ৮ জনকে অভিযুক্ত করে। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি হয়। তাদের মধ্যে লুই কিং একদিন পূর্বেই কারা অভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন আর ‘ অস্কার নীবে ‘ কে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফাঁসিতে ঝুলার আগে অগাস্ট স্পীজ বলেছিলেন : ” The day will come when our silence will be more powerful than the voice you are throttling today “.তখন অ্যাডলফ ফিশার বলেছিলেন, ” This is the happiest moment of my life “এবং আলবার্ট পারসন্স বলেছিলেন, ” Let the voices of people be heard……. “তিনি এই বাক্যটি শেষ করার আগেই ফাঁসিতে মৃত্যু হয় তার।


⬛ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের” দৈনিক ৮ঘন্টা কাজ ” এর দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। ১৪ ই জুলাই ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী বছর থেকে আজ পর্যন্ত ১ মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে ” শ্রমিকদের আত্মদান আর দাবি আদায়ের দিন ” বা ” মে দিবস ” হিসেবে।
বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় আশিটির ও বেশি দেশে মে দিবস সরকারি ছুটির দিন। এছাড়া বেশ কিছু দেশে বেসরকারিভাবে পালিত হয়। মজার ব্যাপার হলো যে দেশে এর জন্ম সেই যুক্তরাষ্ট্র ই মে দিবস পালন করে না। কানাডার ক্ষেত্রেও একই কথা। এই দুটি দেশ শ্রমিক দিবস পালন করে থাকে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার।

” তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান “!

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ কুলিমজুর ‘কবিতার এই অসামান্য লাইন দুটো জানান দেয় শ্রমিকের সম্মান, প্রকৃত মর্যাদা।।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!