FactsLatestNews

গোপাল পাঁঠা সেদিন না থাকলে কলকাতা হয়ে যেত পাকিস্তানের অংশ। অজানা ইতিহাস জেনে নিন

১৬ ই আগস্ট, ২০২২, কলকাতাঃ

Presented by: আপনি কি জানেনঃ

গোপাল পাঁঠা (মুখোপাধ্যায়)

কলমে ~ তুষারকান্তি ভট্টাচার্য্য

প্রথমেই বলি, গোপাল পাঁঠা যদি না জন্মাতেন তাহলে কলকাতা আর বাকি (পশ্চিম) বঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান্ হয়ে যেত | পশ্চিমবঙ্গের এই ইতিহাস এখনকার দুটি প্রজন্ম জানেনা | তারা জানুক গোপাল পাঁঠার অবদান | তারা জানুক গোপাল পাঁঠা না থাকলে, তাদের অধিকা্ংশকেই পাকিস্তানের নরক ভোগ করতে হতো।


গোপাল পাঁঠার আদি বাসস্থান তখনকার পূর্ববঙ্গের চৌডাঙ্গা | ১৮৯০ সালে তাঁর পূর্বপুরুষ কলকাতার মলঙ্গা লেনে বসতি স্থাপন করেন | তাঁর পিতৃব্য অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী | অনুকূলচন্দ্র এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটিতে ফিলজফির প্রফেসর্ ছিলেন | ১৯৬৪ তে অনুকূলচন্দ্র পদ্মভূষণ উপাধি পান |

গোপাল ১৯১৩ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন | মারা যান ২০০৫ সালে কলকাতাতেই | দীর্ঘ ৯২ বছর তাঁর জীবন কর্ম্মময় | গোপালের প্রসিদ্ধি হচ্ছে ১৯৪৬ সালে বাংলার মুসলীম্ লীগ্ মুখ্যমন্ত্রী হুসেন্ সুরাবর্দীর আমলে মুসলীম্ লীগের হিন্দুদের ওপর অত্যাচার যার নাম গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস,এর সমুচিত্ জবাব দেওয়া |

গোপালের নামে পাঁঠা যোগ হওয়ার কারণ হল, তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা মাংসের দোকানের জন্য | দোকানটি এখনও আছে কলেজ স্ট্রীটের ওপর মেডিক্যাল কলেজের পূর্ব-দক্ষিণ কোনের উল্টোদিকে |

১৯৪৬ সালের ১৬ই অগাষ্ট থেকে যখন মুসলমানরা দাঙ্গা শুরু করল তখন গোপাল নিজেদের দোকানে ছিল| খবর শুনেই উনি নিজের পাড়ায় এসে দেখেন মুসলীম্ লীগের ছেলেরা বড় বড় লাঠি নিয়ে ঘুরছে | উনি তাঁর গঠিত ভারতীয় জাতীয় বাহিনীর ছেলেদের একত্র করতে শুরু করলেন | বললেন যদি ওরা একটা হিন্দু মারে তোমরা দশটা মুসলমান মারবে যারা হিন্দু নিধন করছে | ভারতীয় জাতীয় বাহিনীতে তখন পাঁচশরও বেশী স্বেচ্ছাসেবক ছিল |

১৬ই আর ১৭ই অগাষ্ট মুসলীম্ লীগের সমর্থকরা এক নাগাড়ে হিন্দু হত্যালীলা চালাল | শুধু ১৭ই অগাষ্টেই সরকারি তথ্য মতে ৭০০০ এর মত হিন্দু নিধন হয়েছিল | আমার পরিচিত দুজন, যাঁরা রাজাবাজার অঞ্চলে মেস্ বাড়ীতে থাকতেন, তাঁদের কেটে মারা হয় | একজন বাবার সহপাঠী, পঞ্চানন্ জ্যাঠামশাই আর একজন দিদিমার বন্ধুর ছেলে নলিনাক্ষ্য মামা |

১৮ই অগাষ্ট থেকে গোপাল তার বাহিনী নিয়ে প্রতি আক্রমণ শুরু করলেন | গোপাল বিশেষ করে বলে দিয়েছিলেন নারী, শিশু আর বয়স্কদের কোন ক্ষতি না করতে | শুধু যারা দাঙ্গা করতে আসছে তাদের মারতে | এই ব্যাপারে গোপালের ডান হাত ছিলেন বিডন্ স্ট্রীটের বিখ্যাত কুস্তীগির বসন্ত |

১৬ই অগাষ্টকে ডাইরেক্ট অ্যাকশন্ ডে ঘোষণা করে সেই দিন থেকেই যে হিন্দু নিধন শুরু হবে, তা মুসলীম লীগ বহুদিন আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল | তাই সেদিন কলকাতার ময়দানে মুসলীম্ লীগ্ নেতাদের ভাষণ শোনার জন্য কলকাতা ও আশপাশের জায়গা থেকে ১ লক্ষ্যের মত মুসলমান লাঠি, ছুরি ইত্যাদি নিয়ে জড় হয়েছিল | নেতাদের ভাষণ শুরু হবার অনেক আগে থেকেই বিক্ষিপ্ত আক্রমন্ আর লুটপাট্ শুরু হয়ে যায় | ঘটনাটা এত অকস্মাত্ হয় যে, হিন্দুরা প্রতিহত করার মানসিকতায় ছিল না | তাই প্রথম দুদিন নির্বিচারে হিন্দু হত্যা হয় |

হিন্দুদের দলবদ্ধ করে প্রতিসংঘাতে যেতে গোপালের দুদিন সময় লেগেছিল | ১৮ই অগাষ্ট থেকে ছবি পাল্টে যায় | গোপালের পরিচালনায় হিন্দুদের সংঘবদ্ধ প্রতিঘাতে মুসলমানরা পিছু হটতে থাকে | খুব কমলোকই জানে গোপাল যদি রুখে না দাঁড়াত তাঁর দলবল নিয়ে, কলকাতা আর এখনকার পশ্চিমবঙ্গ পূর্ব পাকিস্থানের হত, যা জিন্না এবং সুরাবর্দির মতলব ছিল |

কয়েকদিন সমুচিত্ জবাব পাবার পর মুসলীম মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দি বাধ্য হলেন তাঁর কলকাতা আর পার্শবর্তী জেলাগুলি থেকে হিন্দু বিতাড়ন মতলব ত্যাগ করতে | ওঁর মতলব ছিল কলকাতা আর পার্শবর্তী অঞ্চলগুলিকে মুসলমান প্রধান করতে যাতে পূর্ব পকিস্থানে ঢোকানো যায় | উপায়ান্তর না দেখে, সুরাবর্দি গোপালের কাছে শান্তির জন্য দূত পাঠালেন |

মুসলীম্ লীগের ছাত্র শাখার প্রধান জি.জি. আজমীরি, মুসলীম্ জাতীয় বাহিনীর সদস্য মুজিবুর রহমানকে (পরবর্তী কালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা) নিয়ে গোপালের সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ করলেন এই রক্তারক্তি বন্ধ করতে | শেষ পর্য্যন্ত মুসলীম্ লীগকে কলকাতা ও তার আশপাশের অঞ্চলকে হিন্দুমুক্ত করার উদ্দেশ্য ত্যাগ করতে হল |

১৯৪৭-এর গোড়ার দিকে গান্ধীজী কলকাতায় এলেন | এসে হিন্দুদের অস্ত্র সমর্পণ করতে বললেন | গোপালকে গান্ধীজীর সেক্রেটারী যখন অস্ত্র সমর্পণ করতে বললেন, তখন গোপাল উত্তর দিয়েছিলেন – “কোথায় ছিলেন গান্ধীজী যখন ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ চলছে | আমি একটা পেরেকও সমর্পণ করব না যেটা হিন্দু সম্মান রক্ষা করতে ব্যবহার করেছি “|

এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, মহম্মদ্ আলি জিন্নার স্বপ্ন ছিল সমগ্র বাংলাকে পাকিস্থানের অংশ হিসাবে নিয়ে দেশ ভাগ করা | সেই উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দি তার ১৬ই অগাষ্টের ভাষণে মুসলমানদের বলেছিলেন – পুলিশ আর সশস্ত্র বাহিনীকে আমি সংযত থাকার ব্যবস্থা করেছি | এতে মুসলমানেরা কাফের হত্যায় লাগামছাড়া উত্সাহিত হয়ে ওঠে | হত্যালীলা অদম্যভাবে চলতে থাকায় প্রচুর হিন্দু কলকাতা ছেড়ে অন্য প্রদেশে পালাতে শুরু করল | হাওড়া ষ্টেশন্ পৌঁছবার জন্য বেপরোয়া হয়ে নৌকো করে গঙ্গা পেরোবার সময়, মুসলমানরা বড় বড় বজরা দিয়ে নৌকোগুলোকে ধাক্কা মেরে ডুবিয়ে দিয়েছিল |


যদি কলকাতা আর তার আশপাশের অঞ্চলকে এই ভাবে মুসলমান্ প্রধান করা যেত, তাহলে মুসলীম্ লীগের চাহিদা, কলকাতা, ২৪ পরগণা আর হুগলীকে পূর্ব পাকিস্থানে ঢোকানো, আরও জোরদার হোতো | সুরাবর্দি এই কাজটা খুব তাড়তাড়ি করতে চেয়েছিলেন | কারণ তিনি জানতেন দিল্লীর ভাইসরয় লর্ড আর্চিবল্ড ওয়াভেলের তাঁর ওপর নানা কারণে আস্থা কমে আসছে, তার ওপর এই হত্যালীলার পুরো রিপোর্ট পেলে ওয়াভেল নিশ্চয়ই বাংলার মুসলীম্ লীগের সুরাবর্দি সরকারকে সরিয়ে দেবে | হলও তাই |

লর্ড ওয়াভেল্ ২১শে অগাষ্ট, ১৯৪৬-এ বাংলার মুসলীম্ লীগ সরকারকে হটিয়ে দিলেন | গোপাল পাঁঠা যদি মুসলিম্ আক্রমণের প্রতিঘাত না করতেন, তাহলে আজ ওই সব অঞ্চলের হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্থানের বাসিন্দা হত | তারপর হত হিন্দু খেদানো পূর্ব পাকিস্থান থেকে | কারণ হিন্দুরা কাফের | ১৯৪৭ সালের পর থেকে পূর্ব পাকিস্থানে হিন্দু সংখ্যা কমার উদাহরণ দিচ্ছি –
১৯৫১ সালে হয় ২২.০৫ শতাংশ, ১৯৬১ তে ১৮.৫ শতাংশ, ১৯৭৪ এ (বাংলাদেশ হওয়ার পর) ১৩.৫ শতাংশ, ১৯৮১ তে ১২.১৩ শতাংশ, ১৯৯১ তে ১০.৫১ শতাংশ, ২০০১ এ ৯.২ শতাংশ আর ২০১১ তে ৮.৯৬ শতাংশ | এই হারে চলতে থাকলে ২০৩১ এ মেরেকেটে বাংলাদেশের জনসংখ্যার মোটে ৫ শতাংশ হিন্দু থাকবে |

গোপাল নেতাজী সুভাষচন্দ্রের গোঁড়া সমর্থক ছিলেন | গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলনে ওঁর একটুও বিশ্বাস্ ছিল না | গোপাল ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের খুব আস্থাভাজন ছিলেন |

পরবর্তীকালে গোপাল সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন | তিনি সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করেন –

“National Relief Centre for Destitutes”.

তাঁর প্রতিষ্ঠিত মলঙ্গা লেন কালীপূজা একটি বিখ্যাত কালীপূজা |

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!